গাজী তাহের লিটন,বিশেষ প্রতিনিধি।।
বাংলাদেশের লোকসংগীতের কিংবদন্তী শিল্পী আব্দুল আলীমের ৮৯ তম জন্মবার্ষিকী অনেকটা নীরবেই বিদায় নিল। সংগীতে যাঁর অসামান্য অবদান তাঁকেই জাতি স্মরণে রাখলো না।
শিল্প-সংস্কৃতির প্রাচুর্যে মোড়ানো আমাদের এই প্রিয় দেশ বাংলাদেশ। এদেশের রয়েছে হাজার বছরের ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। রয়েছে বৈচিত্র্যময় সঙ্গীতসম্ভার। যার মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি ধারা হচ্ছে লোকসঙ্গীত। আবহমান বাংলার নিজস্ব এই সঙ্গীতধারায় গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনযাত্রা, সুখ-দুঃখের কথা ফুটে ওঠে।
অসাধারণ কণ্ঠ-ঐশ্বর্যে লোক সঙ্গীতের এই ধারাকে যিনি সার্বজনীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন, তিনি লোক সঙ্গীতশিল্পী আবদুল আলীম। লোকসঙ্গীতকে তিনি অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যেখানে জীবন জগৎ এবং ভাববাদী চিন্তা একাকার হয়ে গিয়েছে।বাংলাদেশের লোক সঙ্গীতের উৎকর্ষতায় তার অবদান অবিস্মরণীয়।
বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গণে যার এতবড় অবদান স্বাধীনতার ৪৭ বছরেই অনেকেই ভুলে গেছে তাঁকে। অথচ, বার্হিবিশ্বে বাংলা গান বিশেষ করে লোকগানকে তিনি পরিচিত করেছেন তার অসাধারণ কণ্ঠমাধুর্যে। বাংলা গানের প্রবাদপ্রতীম এই শিল্পীকে কেউ সেভাবে মনে রাখেনি। শুধুমাত্র কয়েকটি চ্যানেলে তার গুটি কয়েক গান গাওয়া ও প্রচারের মধ্যেই স্মরণ করা হচ্ছে সঙ্গীতের এই বাতিওয়ালাকে। আব্দুল আলীমের মৃত্যু পরবর্তী তার পুত্র-কন্যা ছাড়া তেমন কাউকে সেভাবে তাঁর গান গাইতেও দেখা যায় না।
বাংলাদেশের লোক সঙ্গীতের প্রাণ পুরুষ, লোক সঙ্গীতের সম্রাট তিনি। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই ভারতের পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সঙ্গীতপ্রতিভা আব্দুল আলীম জন্মগ্রহণ করেন।১৯৭৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ ইউসুফ আলী। বাল্যকাল থেকেই আব্দুল আলীম সঙ্গীতের প্রবল অনুরাগী ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শুনে গান গাওয়ার জন্য আগ্রহ জন্মে।
আব্দুল আলীমের নিজ গ্রামেরই সঙ্গীত শিক্ষক সৈয়দ গোলাম ওলীর কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। ওস্তাদ তাঁর ধারণ ক্ষমতা নিরীক্ষা করে খুবই আশান্বিত হলেন। গ্রামের লোক আব্দুল আলীমের গান শুনে মুগ্ধ হতো। পালা-পার্বণে তাঁর ডাক পড়তো। আব্দুল আলীম গান গেয়ে আসর মাতিয়ে তুলতেন। সৈয়দ গোলাম ওলী আব্দুল আলীমকে কোলকাতায় নিয়ে গেলেন। কিছুদিন কোলকাতা থাকার পর তাঁর মন ছুটলো ছায়াঘন পল্লীগ্রাম তালিবপুরে। কিন্তু ওখানে গান শেখার সুযোগ কোথায়? তাই বড় ভাই শেখ হাবিব আলী একরকম ধরে বেঁধেই আবার কলকাতা নিয়ে গেলেন।
শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক গেলে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বড় ভাই শেখ হাবিব আলী আব্দুল আলীমকে নিয়ে গেলেন সেই অনুষ্ঠানে। আব্দুল আলীমের অজ্ঞাতে বড় ভাই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে তাঁর নাম দিয়ে ছিলেন গান গাইবার জন্য। এক সময় মঞ্চ থেকে আব্দুল আলীমের নাম ঘোষণা করা হলো। শিল্পী ধীর পায়ে মঞ্চে এসে গান ধরলেন, ‘‘সদা মন চাহে মদিনা যাবো।’’ মঞ্চে বসে আব্দুল আলীমের গান শুনে শেরে-বাংলা শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। কিশোর আলীমকে জড়িয়ে নিলেন তাঁর বুকে। উৎসাহ দিলেন, দোয়া করলেন এবং তখনই বাজারে গিয়ে পাজামা, পাঞ্জাবী, জুতা, পুটি, মোজা সব কিনে দিলেন। এভাবে পালা পার্বণে গান গেয়ে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তাঁর গানের প্রথম রেকর্ড হয়। রেকর্ডকৃত গান দুটি হলো ‘তোর মোস্তফাকে দে না মাগো’ এবং ‘আফতাব আলী বসলো পথে’। এতো অল্প বয়সে গান রেকর্ড হওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। অবশ্য পরে তা আর বিস্ময় হয়ে থাকেনি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার লোক সঙ্গীতের এক অবিসংবাদিত কিংবদন্তি পুরুষ। এদেশের মাটির গান পল্লীগানকেই শিল্পী আব্দুল আলীম প্রাণের গান হিসেবে বেছে নিলেন। এর আগে তিনি ইসলামী গানসহ প্রায় সব ধরনের গান গাইতেন। গান শেখার ক্ষেত্রে আর যাঁরা তাঁকে সব সময় সহযোগিতা ও উৎসাহ দিয়েছেন- তাঁদের মধ্যে বেদার উদ্দিন আহমেদ, আবদুল লতিফ, শমশের আলী, হাসান আলী খান, মোঃ ওসমান খান, আবদুল হালিম চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
একটা সময় তিনি কলকাতায় গিয়ে আব্বাসউদ্দিন ও কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে গান করেছেন। দেশ ভাগের পরে আব্দুল আলীম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিওতে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে গান গাইতে শুরু করেন। তিনি পল্লীকবি জসিমউদ্দীন, এম ওসমান খান, আব্দুল লাতিফ, শমশের আলীর সংস্পর্শে গান করে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
আব্দুল আলীম লেটো দলে, যাত্রা দলে কাজ করেছেন। পরে টেলিভিশন সেন্টার চালু হলে সেখানেও তিনি সঙ্গীত পরিবেশন শুরু করেন। এছাড়াও তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ সহ বিভিন্ন বাংলা চলচ্চিত্রে আব্দুল আলীম গান করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হচ্ছে- ‘লালন ফকির’।
আব্দুল আলীম তাঁর আধ্যাত্মিক ও মরমী মুর্শিদী গানের জন্য অমর হয়ে আছেন। লোক সঙ্গীতে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার কণ্ঠে পদ্মা মেঘনার ঢেউ যেন আছড়ে পড়ে শ্রোতার বুকের তটভূমিতে। মানুষের মনের কথা, প্রাণের সাথে প্রাণ মিলিয়ে যে গানের সুর আবদুল আলীমের কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হতো, তা শুধু এই বাংলা ভাষাভাষীদের মনেই নয়; বিশ্বের সকল সুর রশিক যারা, বাংলা ভাষা জানেন না- তাদেরও আপ্লুত করতো।
পেশাগত জীবনে আবদুল আলীম ছিলেন ঢাকা সঙ্গীত কলেজের লোকগীতি বিভাগের অধ্যাপক। প্রতিভাধর এই শিল্পী বিদেশে যেখানেই গেছেন সেখান থেকে সঙ্গীত পরিবেশন করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হয়ে ১৯৬৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৬৬ সালে চীন সফর করেন। এই দুই দেশেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। বিদেশে বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের মান বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে শিল্পী আবদুল আলীমের অবদান অসামান্য।
সবুজ শ্যামল প্রান্তর আর অগুণতি নদীর দেশ বাংলাদেশ, কলকাকলিতে মুখরিত আমাদের প্রকৃতির পরতে পরতে একজন আব্দুল আলীম বেঁচে থাকবেন সুরের স্বমহিমায়।
এ জাতীয় আরো খবর..
Leave a Reply