দণ্ডপ্রাপ্ত শিক্ষকের শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান হওয়া নিয়ে প্রশ্ন, দেশ-বিদেশে সমালোচনা।
মোঃ জসিম উদ্দিন, রাজশাহী বিভাগীয় ব্যুারোঃ
অসদাচারণের অভিযোগে রুজু হওয়া বিভাগীয় এক মামলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দণ্ডপ্রাপ্ত হন রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলম। বিতর্কিত বেশকিছু কর্মকাণ্ডের পর এ পদে তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশ-বিদেশে শুরু হয়েছে সমালোচনা।
সূত্র জানিয়েছে, প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলম রাজশাহী নিউ গভমেন্ট ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ থাকাকালীন কলেজ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (সিইডিপি) আওতায় প্রশিক্ষণ গ্রহণে মালয়েশিয়ায় যান। ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহাম মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসে (ইউএনএমসি) অনুষ্ঠিত প্রশিক্ষণে নন-সাবমিশনের কারণে ইউএনএমসি তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি কর্মচারি (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ২০১৮ এর ৩ (খ) অনুযায়ী ‘অসদাচারণ’র অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়।
সূত্র জানায়, অলীউল আলম নোটিশের জবাব দিয়ে ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। শুনানিতে তার বক্তব্য নেয়া হয়। তিনি অসুস্থতার কারণে এসাইনমেন্ট জমা দিতে পারেননি বলে যুক্তি দেখান। আগেও তার বিরুদ্ধে নিজের অফিসের শিক্ষকদের অভিযোগ ছিল। যে কারণে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের এ কর্মকর্তাকে কয়েকবার বদলি (ওএসডি) করে সরকার। ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের (সরকারি কলেজ-৩ অধিশাখা) সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপনের কপি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অলীউল আলম রাজশাহী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন লাভ করেন। সেখানে ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি যোগদান করেন তিনি। পরবর্তীতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের শিক্ষকদের মামলার কারণে ওই বছরের জানুয়ারি মাসেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি করা হয়।
তবে মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণে গিয়ে এসাইনমেন্ট জমা না দেয়ার কারণ হিসেবে অসুস্থতা, ঘন ঘন বদলি ও পবিত্র হজব্রত পালনের কথা উল্লেখ করেন অলীউল আলম। ইউএনএমসি তাকে অযোগ্য ঘোষণা করায় তাকে লঘুদণ্ড প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অলীউল আলমের ব্যক্তিগত শুনানিতে প্রদত্ত জবানবন্দি এবং আলোচ্য বিভাগীয় মামলা সংক্রান্ত সকল রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের একই প্রজ্ঞাপনে সরকারি কর্মচারি বিধিমালা মোতাবেক তাকে ‘তিরস্কার’ দণ্ড প্রদান করা হয়।
তিনি বর্তমানে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে অপেশাদার আচরণ শুরু করেছেন তিনি। গত রোববার (২৮ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্য সাইদুর রহমানের সঙ্গে তিনি মারমুখী আচরণ করেন। ওইদিন বেলা ১১টার সময় সাইদুর রহমান পেশাগত দায়িত্ব পালনে শিক্ষাবোর্ডে যান। তাকে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রেখে একপর্যায়ে বিদ্যালয় পরিদর্শক জিয়াউল হক ও কয়েকজন কর্মচারীকে নিয়ে মারতে উঠেন প্রফেসর অলীউল। এসময় প্রেসক্লাব সভাপতিকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজও করেন তিনি।
এমন আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বৃহস্পতিবার (২ মে) সন্ধ্যায় রাজশাহী প্রেসক্লাবে জরুরি সভা করেছে জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদ নামে অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠন। সভা থেকে তাকে ৭ দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও আইনজীবীসহ রাজশাহীর বিশিষ্টজনরা। এছাড়া বিদেশেও রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা শুরু হয়েছে।
জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের আমেরিকা শাখার আহবায়ক প্রকৌশলী শামসুল আলম, রাশিয়া শাখার আহবায়ক তালহা রহমান শুভ্র, কানাডা শাখার আহবায়ক মাসুন্নবী জাহাঙ্গীর ও জার্মানি শাখার আহবায়ক জামিনুল হক বিদ্যুৎ পৃথক বিবৃতিতে রাজশাহী প্রেসক্লাব সভাপতির সঙ্গে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যানের ঘটনার প্রতিবাদ জানান। একইসঙ্গে তাকে অপসারণের দাবিও জানান তারা।
এদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেই দণ্ডপ্রাপ্ত শিক্ষক কীভাবে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেলেন, তা নিয়ে নতুনভাবে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল একটি সূত্রের বরাতে গুঞ্জন উঠেছে, প্রফেসর ড. মো. অলীউল আলম বিপুল পরিমান অর্থের বিনিময়ে রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন নিয়েছেন। চাঁদপুরের এক শিক্ষকের মাধ্যমে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী (বর্তমান সমাজকল্যাণমন্ত্রী) ডা. দীপু মনির সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। এরপর তিনি রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে প্রেষণে নিয়োগ নেন। তবে তাপদাহ কমলেই তাকে প্রত্যহার ও শাস্তির দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচিতে নামার হুশিয়ারি দিয়েছে জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদ।