এক কিলোমিটার সড়কের জায়গায় করা হয়েছে ৯৭০ মিটার। ৩ মিটার প্রস্থের জায়গায় করা হয়েছে ২ দশমিক ৮৯ মিটার। সড়কের পাশে ও ঢালে কোনো ঘাস লাগানো হয়নি। সড়কে কোনো মাটি ভরাটও করা হয়নি। ১৪টি ইউড্রেনের জায়গায় করা হয়েছে মাত্র ২টি, ৩০ মিটার আরসিসি প্যালাসাইডিংয়ের জায়গায় করা হয়েছে ২৪ দশমিক ৪০ মিটার। ৩০ মিটার ড্রামশিট ও গজারি কাঠের প্যালাসাইডিং করা হয়নি। সড়কের প্রায় ৩০০ মিটার অংশে ইটের কোনো হদিস নেই।
এই অবস্থায় ঠিকাদার ‘কাজ শেষ’ করেছেন। চূড়ান্ত বিলও তুলে নিয়েছেন। সড়কটি হলো যশোরের অভয়নগর উপজেলার ধুলগ্রাম ইব্রাহিম খন্দকারের বাড়ি থেকে বিশ্বনাথ নন্দীর তেমাথা ভায়া নিখিল চক্রবর্তীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা এইচবিবিকরণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় ২০২১-২০২২ অর্থবছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অভয়নগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। রাস্তায় দুই স্তরে ইট বোনা হয়েছে। নিচের স্তরে পুরোনো ইট দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো বালু দেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান বলেন, শিডিউলে যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে সড়কের কাজ করা হয়েছে। সড়কে আগে কোনো ইট ছিল না। সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কে বা কারা তা নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, সড়কের দৈর্ঘ্য ৯৯০ মিটার করা করা হয়েছে। এক বীর মুক্তিযোদ্ধার অনুরোধে তাঁর বাড়ির পাশে ১০ মিটার সড়ক করা হয়েছে। তবে প্রস্থ ঠিক আছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার ২২৭ টাকা ব্যয়ে উপজেলার ধুলগ্রাম ইব্রাহিম খন্দকারের বাড়ি হতে বিশ্বনাথ নন্দীর তেমাথা ভায়া নিখিল চক্রবর্তীর বাড়ি পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়ক এইচবিবি করার জন্য গত ৮ মার্চ দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৫০ টাকা চুক্তিমূল্যে সড়কের কাজ পায় যশোরভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান ব্রাদার্স। গত ৫ মে থেকে শুরু হয়ে গত ১৪ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজ শেষ হয় গত সেপ্টেম্বর মাসে। সড়কের মাটি ভরাট বাবদ ৬ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪০ টাকা, সড়কের পাশে এবং ঢালে ঘাস লাগানোর জন্য বরাদ্দ ছিল ৬৭ হাজার ৬০ টাকা, ১৪টি ইউড্রেন নির্মাণের জন্য ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯০০ টাকা, ৩০ মিটার আরসিসি প্যালাসাইডিং ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭৬ টাকা ২০ পয়সা, ৩০ মিটার ড্রামশিট ও গজারী কাঠের প্যালাসাইডিং ৪৯ হাজার ৬৪৯ টাকা ১০ পয়সা এবং পানি সেচ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৪৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া সাইনবোর্ড তৈরির জন্য ৩ হাজার টাকা এবং নামফলক তৈরির জন্য ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল।
গত ৩০ মে, ১৩ আগস্ট এবং সর্বশেষ গত ৫ ডিসেম্বর তিন দফা সড়কটি ঘুরে দেখেছেন এ প্রতিবেদক। তিন বারই সড়কটির কোথাও কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। তবে প্রথমবার গিয়ে দেখা গেছে, সড়কটি খুঁড়ে মাটি পাশে রাখা হয়েছে। প্রায় ৩০০ মিটার অংশে সড়কের পাশে আগের ইট বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দ্বিতীয়বার গিয়ে দেখা গেছে, সড়কটির বেশির ভাগ অংশে ইটের সলিং করা হয়েছে। কয়েকটি অংশে কাজ বাকি। দুটি কালভার্টের নির্মাণকাজ চলছে। তবে সড়কের পাশের কোনো ইট পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গিয়ে দেখা গেছে, সড়কে ঢোকার মুখে ছোট একটি নামফলক রয়েছে। সড়কের ১০০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জায়গায় ৯৭০ মিটার এবং ৩ মিটার প্রস্থের জায়গায় করা হয়েছে ২ দশমিক ৮৯ মিটার। জোড়বাংলা পুকুর পাড়ে সড়কের পাশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে সড়কের পাশে কোনো ঘাস দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে মেসার্স খান ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আবদুস সোবহান খান বলেন, শিডিউলে যা যা আছে সবই করা হয়েছে। অফিস কাজ দেখে চূড়ান্ত বিল দিয়েছে।
গ্রামের কলেজছাত্র শেখ সাকিব আহমেদ বলেন, রাস্তায় বেড কাটার সময় যে মাটি উঠেছিল, সেই মাটি দিয়ে রাস্তা করা হয়েছে। নতুন করে কোনো মাটি দেওয়া হয়নি। রাস্তা করার সময় কোনো পানি দেওয়া হয়নি। একটি মাছের ঘেরের পাড়ে কিছুটা আরসিসি প্যালাসাইডিং দেওয়া হয়েছে। তবে জোড়বাংলা পুকুর এলাকায় ড্রাম শিট ও গজারি কাঠের প্যালাসাইডিং দেওয়া হয়নি। এ জন্য পুকুরের পাড়ে রাস্তায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।
গ্রামের কৃষক নূর ইসলাম অভিযোগ করেন, গ্রামের ইব্রাহিমের খন্দকারের বাড়ি থেকে জোড়বাংলা পুকুর পর্যন্ত রাস্তায় ইট ছিল। রাস্তা
করার সময় সেই ইট তুলে নতুন ইটের সঙ্গে রাস্তায় দেওয়া হয়েছে। রাস্তায় দুই স্তরে ইট বোনা হয়েছে। নিচের স্তরে পুরোনো ইট দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো বালু দেওয়া হয়নি। রাস্তা এখনই উঁচু নিচু হয়ে গেছে।
আরেক কৃষক ওহাব শেখ বলেন, ‘রাস্তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ দুটোই কম করা হয়েছে। ইট অত্যন্ত নিম্নমানের। ঠিকমতো বালু দেওয়া হয়নি।’
Leave a Reply