মোহাম্মদ দুদু মল্লিক শেরপুর প্রতিনিধিঃ
গারো পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদীগ্রাম শুল্ক ষ্টেশন স্থাপন পরিকল্পনাটি দীর্ঘ ২২ বছর যাবৎ লাল ফিতায় বন্দী হয়ে পড়েছে। এতে আমদানী, রফতানীকারক ও ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছে। ভারতের মেঘালয় প্রদেশের সীমান্তে ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক বন্দর বৈদেশিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে সরকারীভাবে বলা হয়েছে। হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন স্থাপনের বিষয়টি সরকার ব্যাপক পর্যালোচনা করে তা স্থাপনের জন্য সরকারীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (শুল্ক) গত ০৩/০৪/১৯৯৫ ইং একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৭৫টি স্থল শুল্ক ষ্টেশন স্থাপনের তফসিল ঘোষণা করে। উক্ত প্রজ্ঞাপন তফসিলে হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন ৭৭নং তালিকায় পড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উক্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপন নং ১৫৯৫/কাস/৯৫ ঈঁংঃড়সং ধপ, ১৯৬৯ (রা ড়ভ ১৯৬৯) – এর ঝবপঃরড়হ ৯ (ন) ধহফ (প) – এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসআরও নং ১৫/উ/ঈটঝ/৭২ তারিখ ঃ ২৯ এপ্রিল ১৯৭২ এসআরও নং- ১৪৪/ডি/কাস/৭৪ তারিখ ঃ ২৫/০৪/৭৪ এসআরও নং ১৮৪-এল/৭৯/৪৯২/ডি/কাস/ তারিখ ঃ ২৬/০৬/৭৯ এসআরও নং- এল/৮১/৬৬২/কাস তারিখ ঃ ২৮/০৮/৮১ এবং এসআরও নং ৩৯৮/এল/৮৯/১২৪৯/কাস তারিখ ঃ ২৫/১১/৮৯ পূর্বক জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। (ক) নিম্নবর্ণিত তফসিলের দ্বিতীয় কলামে উল্লেখিত স্থল শুল্ক ষ্টেশন সমূহ, বাংলাদেশ স্থল ও অভ্যন্তরীণ জল পথে আমদানী এবং রফতানীতব্য মালামালের উপর শুল্ক/কর আরোপের উদ্দেশ্যে স্থাপন করিল এবং (খ) উক্ত তফসিলের তৃতীয় কলামে উল্লেখিত জড়ঁঃবং- কে উহার চতুর্থ কলামে উল্লেখিত শ্রেণীর মালামালের জন্য অনুমোদিত রুট হিসাবে স্থল ও অভ্যন্তরীণ জল পথের জন্য সুনির্দিষ্ট করিল যথা (১) বাংলাদেশে আগমন ও বিহর্গমন অথবা (২) উক্ত তফসিলের দ্বিতীয় কলামে উল্লেখিত স্থল শুল্ক ষ্টেশন হতে অভ্যন্তরীণ জল ও স্থল পথে ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত আগমন ও বহির্গমন। উক্ত প্রজ্ঞাপনের তফসিলের তালিকায় ৭৭ নং ক্রমিকে হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশনে অনুমোদিত রুট হলো শেরপুর হলদীগ্রাম রোড এবং সীমান্তে প্রবিষ্ট মহারশী শাখা নদী। প্রজ্ঞাপনে উক্ত রুটে আমদানী ও রফতানীতব্য মালামালের বর্ণনায় রয়েছে এসআরও নং ১৪/ডি/৭২, তারিখ ঃ ২৪/০৪/৭২ এর পার্ট – রর এর অধীনে সুনির্দিষ্টকৃত ওজনের মালামাল (অতঃপর টেবিল হিসাবে উল্লেখিত)। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আদেশক্রমে গত ০৩/০৪/১৯৯৫ তারিখে প্রথম সচিব (শুল্ক) স্বাক্ষরিত উক্ত প্রজ্ঞাপনে হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হলেও অদ্যবধি কোন উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অথচ দীর্ঘদিন থেকে হলদীগ্রামে স্থল শুল্ক বন্দর স্থাপনের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা উপলদ্ধি করে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার পর্যালোচনা হয়েছে। বহুবার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কোন ফল পাওয়া যায়নি। দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ী মহল থেকেও স্থল বন্দর স্থাপনের দাবী জোরে-সোরে উপস্থাপিত হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। বিষয়টি নীতিগতভাবে সরকার গ্রহণ করলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমদানী ও রফতানীকারকরা হতাশ হয়ে পড়েছে। এদিকে, হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন চালু হলে কামালপুর স্থল বন্দরের জট কমে আসবে এবং রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে যে সমস্ত মালামাল কামালপুর স্থল বন্দর হয়ে বাংলাদেশে আসে তা প্রায় ১শ কিলোমিটার বেশী রাস্তা ঘুরে আসে। অথচ হলদীগ্রাম স্থল বন্দর চালু হলে ঐ অতিরিক্ত ১শ কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হবে না। ফলে পরিবহন খরচ ২০ ভাগ কমে যাবে। এছাড়া হলদীগ্রাম থেকে প্রশস্ত ফিডার রোড থাকায় মাত্র সাড়ে ৩ ঘন্টায় মালামাল ঢাকায় পরিবহন করা সম্ভব হবে। হলদীগ্রামে বিপরীতে ভারতের সিসিং পাড়া থেকে তোড়া জেলা শহরে যেতে সময় লাগে মাত্র ৩ ঘন্টা। তোড়া শহর থেকে শিলং মাত্র ৬ ঘন্টা। মোট কথা শিলং থেকে মালামাল হলদীগ্রাম স্থল বন্দর হয়ে ঢাকায় আসতে সময় নেবে মাত্র ১৩/১৪ ঘন্টা। অপরদিকে, হলদীগ্রাম থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরের ব্যাংকের দূরত্ব মাত্র ৪ কিলোমিটার। পাকা সড়ক থাকায় হলদীগ্রাম থেকে ঝিনাইগাতী যাতায়াত করলে সময় লাগে মাত্র ৫/৬ মিনিট। এছাড়া আমদানী, রফতানী পণ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সীমান্ত পর্যন্ত এক কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা, ফায়ার হাইড্রো সিষ্টেম স্থাপন করলে হলদীগ্রামে স্থল শুল্ক ষ্টেশন চালু করা যায়। এখানকার মানুষের জীবিকার কোন পথ নেই বললেই চলে। হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন চালু হলে পাহাড়ী আদিবাসী সহ বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহের পথ বের হবে। ঝিনাইগাতীর বিশিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীরা হলদীগ্রাম স্থল শুল্ক ষ্টেশন স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, প্রাথমিক ভাবে এ পথে চাল, পাথর, কয়লা, ফলমূল, বাঁশ ইত্যাদি ভারত থেকে আমদানী করা যায়। তিনি বলেন, ভারতের গারো পাহাড় অঞ্চলে কাঁকড়া, কুইচা, তেতুল বিঁচি, ইলিশ মাছ, কচ্ছপ ও পানের বিপুল চাহিদা রয়েছে। এসব পণ্যের রফতানি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সুগম হবে। তারা আরও বলেন, হলদীগ্রাম থেকে ঢাকার সড়ক যোগাযোগে ফিডার রোড ব্যবস্থা ভাল থাকায় রফতানী ও আমদানীকৃত পণ্যও দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রæত পরিবহন করা সম্ভব হবে।
Leave a Reply