রুহুল আমিন রুকু কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ
গত কয়েক দিনে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের উলিপুরে বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। ধরলা, তিস্তা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তবে গত ২৪ ঘন্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৭৭ সেঃমিঃ উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদ-নদীর তীরবর্তী স্থান গুলোতে ব্যপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। পানি বন্দী হয়ে পড়েছে চর-দ্বীপচর ও নিম্নেঅঞ্চলের প্রায় ২২ হাজার পরিবার।
উপজেলার নদ-নদী কবলিত বেগমগঞ্জ, বুড়াবুড়ি, হাতিয়া, সাহেবের আলগা, দলদলিয়া, থেতরাই, বজরা ইউনিয়নের বেগমগঞ্জ মাষ্টারপাড়া, কবিরাজ পাড়া, মসালের চর, শেক পালানু, পূর্ব দূর্গাপুর, চিতুলিয়া, নামাজের চর, চর বাগুয়া, গেন্দার আলগা, কাজিয়ার চর, ঘুঘু মারি, কলাকাটা, সাতভিটা, ফকির মোহাম্মদসহ বিচ্ছিন্ন চর-দ্বীপচর ও নিম্ন অঞ্চল গুলো প্লাবিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম পনি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানাগেছে, গত ২৪ ঘন্টায় ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ৭৬ সেন্টিমিটার বিপদ সীমার উপর দিয়ে, তিস্তা নদীর পানি কাউনিয় পয়েন্টে ২৯ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদ সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৬৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এবং চিলমারী পয়েন্টে বিপদ সীমার ৭৭ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এ অঞ্চলের প্রায় ৪ শ’ হেক্টার জমির গ্রীস্মকালীন ফসল পটল, ঢেঁড়শ, করলা, ঝিঙা, মরিচ,চেচিংগাসহ সবজিতে পানিতে তলিয়ে গেছে। এ সকল উঠতি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিপাকে পড়েছে দরিদ্র কৃষকেরা। আরপদিকে বিভিন্ন স্থানে নদীর ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে । গত কয়েক দিনের ভাঙ্গনে উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী থেতরাই পাকার মাথা, দড়ি কিশোরপুর, গোড়াইপিয়ার, দালালীপাড়া, হোকো ডাঙ্গা মাঝিপাড়া, নগরপাড়া, দলদলিয়া ইউনিয়নের চাপরারপাড়, বসুনিয়াপাড়া, অর্জুন এবং ব্রহ্মপুত্র নদ তীরবর্তী বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের আক্কেল মামুদ, কবিরাজ পাড়া, সরকার পাড়া, মিয়াজী পাড়া ও বালাডোবা বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বুড়াবুড়ি’র ফকির মহাম্মদ এবং হাতিয়া নয়াডাড়া গ্রামের প্রায় অর্ধশত পরিবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভিটেমাটি হাড়িয়েছে। ভাঙ্গন প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসকল গ্রামের স্থায়ী সবত ভিটা, মসজিদ- মন্দরি, রাস্তা-ঘাট ও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শীঘ্রই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলসহ চরাঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ গত ৫ দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে জীবন যাপন করছে। এসব এলাকায় শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে পড়েছেন বন্যাকবলিতরা। বানভাসীদের হাতে কাজ না থাকায় খাদ্য সংকটে পড়লেও এখনো কোন সরকারী বা বেসরকারী ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়নি। বন্যা কবলিত এলাকা গুলো কাঁচা সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় একমাত্র নৌকা নির্ভর হয়ে পড়ছেন মানুষজন। বেগমগঞ্জে ইউনিয়নের বন্যাকবলিত অনেক পরিবার বাড়িতে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায়। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গুচ্ছগ্রাম ও বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে গরু ছাগল হাঁস মুরগি ও পরিবারের লোকজনসহ আশ্রয়ের সন্ধানেে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। হাতিয়া ইউনিয়নের চর অনন্তপুর গ্রামের আব্দুর রহমান, নজর আলী, ইসলাম মিয়া, আজাহার আলীসহ অনেকেই জানান, ঘরের ভিতর থেকে পানি নেমে না যাওয়ায় কেউ চৌকি আবার কেউ বাঁশের মাচানের উপর পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছি। এ অবস্থায় ঘরে খাবার ও হাতে কাজ না থাকায় দুঃচিন্তায় পড়েছেন। সরকারী ভাবে কোন সাহায্য করছে না। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাঁচার উপায় থাকবে না তাদের। উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের রাবেয়া বেগম জানান, গরু, ছাগল, হাস, মুরগী নিয়ে বিপদে রয়েছি। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। ঠিক মতো রান্নাও করতে পারছি না। ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন জানান, বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আমার ইউনিয়নের প্রায় ১ হাজার পরিবার পানিবন্দী মানুষ জীবন যাপন করছে। কুড়িগ্রাম জলো প্রশাসক ও উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে গেলেও এখনও কোন ত্রাণ সহায়তা পাওয়া যায়নি। এদিকে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সহায়তা জরুরী হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাদের জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল গুলোতে পানি প্রবেশ করায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আশা করছি দ্রুত পানি নেমে যাবে। আর বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মেডিকেল টিমসহ আমাদের সব রকমের প্রস্তুতি নেয়া আছে।
Leave a Reply