জবি প্রতিনিধিঃ
ড. শামছুল কবির :
আমরা জানি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি/ দেশ উন্নত এবং অগ্রসর হতে পারে না। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর বেশিরভাগ ১০০% মানুষ শিক্ষিত। বাংলাদেশ সরকারও শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। ফলে বর্তমান সরকারের জোরালো পদক্ষেপ ও ভূমিকার কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে এবং তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকারের অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। উল্লেখ্য কোভিড-১৯ ও করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে আজ অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং সকল কিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। গত মার্চ মাস থেকে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের সবকিছুই বন্ধ ছিল কিন্তু বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা ও সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে ইতিমধ্যে সীমিত/স্বল্প পরিসরে অফিস আদালত, কলকারখানা ইত্যাদি চালু করেন। কিন্তু কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও চালুর অনুমতি দেননি। এবং কবে চালু হবে তা এখনও সুনিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে এই নিয়ে সরকার দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
এমতাবস্থায় দেশের সকল শিক্ষার্থী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং তাদের যেন সেশনজটে না পড়তে হয় সেইদিক বিবেচনা করে সরকার ইতিমধ্যে প্রযুক্তির মাধ্যমে ও অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে অনলাইনে কবে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে বলে জানা যায়। তাছাড়া দুই/একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর করার কথা ভাবছে ও নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হতে পারে বলে জানা যায়। কিন্তু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর কতটুকু যৌক্তিকতা রয়েছে তা ভাবনা ও চিন্তার বিষয় আছে বলে আমি মনে করি। কারণ বাংলাদেশে যতগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে তারমধ্যে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসকল সুযোগ-সুবিধা আছে তার অনেক কিছুই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোন আবাসন ব্যবস্থা ও নেই কোন হল/হোস্টেল। প্রায় ৭০০ জন শিক্ষক আছেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আবাসন ব্যবস্থা নাই। ফলে শিক্ষকগণ নিজ নিজ বাসায় থেকে কিভাবে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারবে এবং কতটুকু সফল হবে তা প্রশ্নই থেকে যায়।
এছাড়া আরেকটি মূল সমস্যা এই প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রী আছে কিন্তু একটি হল/হোস্টেল নাই এবং কেন আবাসনের ব্যবস্থা নাই। ফলে তাদের বেশিরভাগই মেস/বাসা/বাড়ি ভাড়া করে জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বর্তমান এই মহামারী পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থীর টিউশনি নাই, অনেক শিক্ষার্থীর পার্টটাইম চাকুরি নাই। ফলে একদিকে তারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে তাদের আয়ের কোন উৎস না থাকায় অনেকের জীবনে হতাশা নেমে এসেছে এবং অনেক শিক্ষার্থীর ছাত্রজীবন ধ্বংসের উপক্রম হয়ে পড়েছে।
একটি মানুষের মৌলিক অধিকার/চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষার্থী উপরোক্ত পাঁচটি মৌলিক অধিকার/চাহিদা পূরণে সক্ষম? আমার জানামতে বেশিরভাগই তা পূরণে অক্ষম এবং বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছে এবং করতে হচ্ছে। তাদের অনেকই আর্থিক অনটনে বাসা/ মেস ছেড়ে দিয়েছে এবং এখনও অনেকে দিচ্ছে। তারা অনেকেই শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য জীবন-সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
যেখানে তাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর সেখানে তাদের পক্ষে ওয়াইফাই, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদি চালানো আদৌ সম্ভব কিনা বা এর ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব কিনা তা ভাবনা-চিন্তার বিষয়। তবে শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদাগুলি নিশ্চিত করে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করলে জবির শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হবে, অন্যথায় অনেক শিক্ষার্থীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমি মনে করি।
লেখক: ড. শামছুল কবির।
সহযোগী অধ্যাপক,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
Leave a Reply